অনেক সুন্দর একটি গল্প । A very beautiful story
কোচ এসে থামলো আরিচা ঘাটে...
আরিচায় ঘাট পর্যন্ত বাসের লম্বা লাইন।
কোচে উঠেই প্রথম চিন্তা, আল্লাহ ফেরি যেন তাড়াতাড়ি পেয়ে যাই...
বাস এসে যখন আটকে যায় তখন ফেরি থেকে অনেক দূরে থাকে।ফেরি দেখা যায় না।ধীরে ধীরে চাকা চলে আবার থেমে যায়।
মনটা যে কি অস্থির থাকে.......
মন শুধু আনচান আনচান করে।কখন ফেরিতে উঠবো?ফেরিতে উঠা মানেই একটা নিশ্চিত হওয়া।সময়টা তখন যুদ্ধের মতো।
একটু সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে আবার ব্রেক কষে থেমে যায়।যেই না একটু আশার আলো জাগ্রত হয়,অমনিই আবার সামনে হেলে আর পিছনে সিটে ধাক্কা খাই,ধাম করে ব্রেকে পা দেয় ড্রাইভার।
ফুলানো বেলুনের হাওয়া ফুস করে বেরিয়ে যায় যেমন,তেমনই তখন ফুস হয়ে যায় মন।
কচ্ছপের মতো একটু একটু করে এগুতেই ফেরিকে দেখতে পেলাম।
ঐ যে ফেরি....
কিযে ভালো লাগে।আহা শান্তি পেলাম।অর্ধেক প্রাপ্তি ঘটে যায়।সাদা আর নীল রংয়ের পানিতে ভাসমান যান সমন্বয় দেখতে পেলাম।
একটু করে এগিয়ে ফেরি কাছাকাছি আসতে থাকছে।যতই কাছে আসছে ততই মনটা সেই ক্রিকেট খেলার শেষ দুই বলে দুই রান করার মতো রুদ্ধশ্বাস অবস্থা।
আর দুইটা গাড়ী উঠলেই আমাদের গাড়ি,আর একটা উঠলেই আমাদের সিরিয়াল।
ইসস কি যে অনুভূতির দিন ছিলো......
ফেরির পাটাতন স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই কি যে ভালো লাগতো।মনে হলো আলেকজান্ডার আমি।সব কষ্ট অস্থিরতা ভুলে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে যেন ভিনি ভিডি ভিকির মতই বিজয় পেলাম।
সাঁ সাঁ করে বাস ফেরিতে উঠে পড়লো।
Hino কোচের একটা আলাদা সাউন্ড ছিলো।ঘ্যাং ঘ্যাং করে স্নিগ্ধ মিষ্টি শব্দে ফেরির ডেকের সামনে একটানে উঠে পড়ে।ডানে বামে,সামনে পিছনে করে বাস পজিশনে রেখে ড্রাইভার নেমে পড়ে।একে একে ফেরির সমস্ত জায়গায় গাড়িতে ভরে গেল।
ফেরির ঢালা আস্তে আস্তে উঠে পড়লো।বাস উঠা বন্ধ হয়ে গেল।ফেরির হুইসেল বেজে উঠলো।ঘাট থেকে ফেরি বিচ্ছিন্ন হতে থাকলো ধীরে ধীরে।তবুও কেউ কেউ লাফিয়ে লাফিয়ে ফেরিতে উঠে পরছে।
বাসে আর বসে থাকতে মন চায়না।
ড্রাইভার নেমে গেলেই ব্যাস নিশ্চিন্ত, গাড়িটা এখান থেকে আর সরবে না।নামার জন্য দরজার কাছে এলাম।দরজার সাথেই লাগোয়া পাশে একটা কোচ।খুব লাগালাগি অবস্থা।একই লাইনে তিনটা বাস পাশাপাশি।
বেশ সরু পথ চলার ব্যাবস্থা।স্থুল স্বাস্থ্যবানদের এ পথে চলতে সমস্যা হয়না।একটু স্বাস্থ্যবান হলেই একটু ঝামেলা হয়।কাত কুত করে যাওয়া লাগে।।আর মেয়েদের জন্য আর এক ঝামেলা হয়।সরু পথের ওপাশ থেকে কেউ এলেই, এই চিপাচিপি পথে অপর পাশের জনকে বাসের দরজায় আবার উঠে অপেক্ষা করে পাস দিতে হয়,ষ্টেশনে দাড়ানো ট্রেনের মতো।
সরু এ পথের যাতায়াতে ক্রসিং খুবই নিদারুণ করুন।দুইজনকেই চিপাচিপিতে চিপিয়ে চিপিয়ে বাসের দিকে উল্টো হয়ে বাস ঘেষে পার হতে হয়।ফেরিতে এটা স্বাভাবিক তাই কখনোই খারাপ লাগেনি।
সরু পথের দুইতিন লাইনের বাস পেরিয়ে উপরে উঠার প্রথম সিড়িতে পৌছুলাম।একেবারে চারতলায় চলে এলাম এক দমে।বাতাস আর বাতাস।বাতাসে এলোমেলো হয়ে যায় মন।রেলিং এ দাড়াতে ভীষণ ভালো লাগলো।শীতকালে এখানে আসাই দায়।তখন গুপটি মেরে ঐ বাসেই বসে থাকা।
বেশ সারিবদ্ধভাবে চেয়ার বসানো আছে।অনেকেই বসে আছে।কত ধরণের যাত্রী উপরে উঠছে, নীচে নামছে।নদীর পার ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে,কোথাও চর পরেছে,নৌকা চলেছে মাছ ধরছে কত চিত্রই না দেখা যায়।
শাহ জালাল ছুটে চলেছে পানিকে কেটে কেটে।শাহ আমানত,শাহ পরান,শাহ মুখদুম ঘাটে বাধা।কি চমৎকার ভাবেই না ফেরি ঘুরে যাচ্ছে।উপর থেকে দেখতাম ফেরি ঘুরে লম্বা দিকটা সামনের হয়ে এগিয়ে চলেছে।উপর থেকে বাস গুলোকে বেশ লম্বা দেখাতো।
এনায়েতপুরী,বীর শ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরি আরিচার দিকে ক্রস করে চলে যাচ্ছে।পাশাপাশি দুই ফেরি দুই দিকে যাবার ক্রস করার সময় দুই ফেরির যাত্রীরা আবার হাত তুলে বাই বাই দিতো।খুব ভালো লাগার মুহুর্ত।
ফেরির নাম গুলো পীর,ওলি আওলিয়া আর শহীদদের নামে,তাই পানি পথে রহমত আর বরকতে ভরপুর....
ফেরির মধ্যে অনেক ফেরিওয়ালা ফেরি করে করে অনেক মজাদার খাবার বিক্রি করছে।ফেরির মজাদার মুখরোচক খাবার হলো মুড়িমাখা।ফেরির সেই মুড়ি মাখার স্বাদ আজও লেগে আছে। এমন মুড়ি মাখা আজ অবধি আর কোথাও পাইনি।
বিভিন্ন ধরণের চকলেট,কলাওয়ালা,সিগারেট পান ওয়ালা আর জুতা স্যান্ডেল পলিশওয়ালা ঘুরে বেড়ায় আর উপর নিচে অবলীলায় উঠা নামা করে।কেউ কেউ আবার পিচ্চির দ্বারা চেয়ারে বসে সমানে শরীর ম্যাসেজ করে নিচ্ছে।শরীর যেন তার এঁকেবেঁকে হেলে-দুলে চলেছে।
ফেরির খাবার হোটেল সর্বদাই সদা ব্যাস্ত আর ভীড় লেগেই আছে।সাদা মোটা ভাত, নদীর মাছ,মুরগী,গরুর মাংস দিয়ে দুপুরের খাওয়া।তরকারি যেন বাসন্তি রংয়ের ছড়াছড়িতে চকচক করছে।খাবার শেষে হাতে যেন হলুদের আস্তর।সাথে ডাল ফ্রি আর তা যেন গরম হলুদ পানি।থালা ভর্তি কাচা মরিচ আর লেবু। অনেকেই কচ কচ করে সবুজ মরিচ নিমিষেই খেয়ে যাচ্ছে।
মোটা মোটা কাচের গ্লাসে রাখা টলটলে নদীর জল।অপেক্ষা করার পর আসন পেলাম বসার।ক্ষুধার্ত কম থাকলে পাউরুটির সাথে ডিম দিয়ে তৈরি সুস্বাদু পাউরুটি টোষ্ট খেয়ে নিতাম।সেথায়ও হলুদের আধিক্য। জানিনা এখানেই হিমু ছিলো কিনা,নাকি হিমুর প্রতি ভালবাসা,
হয়তো হুমায়ুন স্যার এই হলুদ প্রীতি দেখেই হলুদ দিয়ে হিমুকে গড়লো কি না...?
হতেও পারে,একেবারেই অমুলক কিন্তু নয়.....
ফেরিতে ভিআইপিদের জন্য আলাদা ব্যাবস্থা থাকায় প্রাকৃতিক কাজের সমস্যা না থাকলে আমাদের আবার সে কাজে নীচে আসতে হয়।
নেমে এলাম।দুই পাশের দুইদিকেই টয়লেট আছে।ভিতরে কেউ একজন আছে।ফাঁকা পাওয়া যায়না।এত মানুষের সমাগমেএকটু অপেক্ষা করতে হয়।কিছুক্ষণ পর পেলাম প্রবেশে....
ভিতরে দেখি গ্লাস বিহীন গোল জানালা।পা একটু উচু করে জানালা দিয়ে বাহিরে দেখতে কেমন লাগে তা দেখছিলাম।খুব বাতাস আসছিলো ভালোইতো লাগছিলো।
চলন্ত ফেরিতে অন্যরকম অনুভূত অনুভব হয়।প্রাকৃতিক কাজ বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতেই মনোনিবেশিত হলো।ভুলেই গিয়েছিলাম প্রাকৃতিক কাজ।
দরজা ধাক্কার ধুমধাম শব্দে হুশ আসে।দ্রুত কাজ সেরে বেরিয়ে এলাম।
ভাবছে ব্যাটার এতক্ষন লাগে?কি করে ওখানে?
নদীর মাঝখান দিয়ে এপার অপারের বৈদ্যুতিক লাইনের বিশাল বড় বড় খাম্বা।
ফেরি খাম্বার পাশ দিয়ে পার হলেই বুঝি অর্ধেক এলাম।মাইলষ্টোন নেই,তাই এই খাম্বাই যেন মাইলষ্টোন।খাম্বা দেখে আবার ভাবতাম,এরকম খাম্বার উপরইতো ব্রীজ বানানো যায়....
মনে কত স্বপ্ন, ইসস যদি ব্রীজ হতো,কত তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতাম....
বেশ বড় গোলাকার খাম্বার পাশে নৌকা ভিড়ানো থাকতো।মানুষ ওখানেও থাকে।কি আশ্চর্য..!
যতক্ষণ না ঘাট এসে যেত, ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরিতে এখানে সেখানে ছোটাছুটি করতাম।কোন জায়গায় স্থির হয়ে বেশিক্ষন থাকতামই না।কতবার যে উপরে নীচে আর নীচে উপরে যাওয়া আসা করতাম।এপাশের সিড়ি বেয়ে নামতাম আবার ওপাশের সিড়ি দিয়ে উঠতাম।
চিপাচিপির ভিতর দিয়ে আবার গাড়ির পাশ দিয়ে ফেরির নীচে পেছনের ডালার দিকে যেতাম।ফেরির ফ্যান দিয়ে পানি কাটছে আর তা যেন বলকে বলকে বড় বড় ফ্যানা হয়ে উঠছে...
চার তলায় গিয়ে চেয়ারে বসে থাকতাম।রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে আবার স্মাটলি আগুনের ধুয়া ছাড়তাম।খুব রোমান্টিক ভাব ছিলো।
'প' 'প' করে শব্দ করা ফেরির একটা হর্ণ বেজে উঠে।আলাদা একটা শব্দ।শুনতে ভালোই লাগে।পানির সাথে কোথায় যেন এর একটা সংযোগ আছে।
নগরবাড়ি ঘাট দূর থেকে দেখতে পেলেই সাংঘাতিক ভালো লাগতো।আহ কি যে শান্তি পেতাম!
ঘাট যতই কাছে আসে, ভালো লাগা ততই তীব্র হয়।ফেরির গতি কমে এলো।একটা ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো।
জেটিতে আস্তে আস্তে ভিড়াতে থাকলো ফেরি।
ফেরির সামনের দিকে মোটা দড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিন চারজন।ফেরি পাটাতনের সাথে ধাক্কা খেতেই এপাশ থেকে ওপাশে দড়ি ছুড়ে মারলো।ফেরি একটু দুলে উঠলো।ফেরির গায়ে বিভিন্ন টায়ার লাগানো থাকায় ধাক্কায় কোন কিছু হয়না।
দড়ি নিয়েই পাটাতনে থাকা লোহার গোলাকার বৃত্তের সাথে পেচিয়ে দিলো,ব্যাস,ফেরি আটকে রইলো।দঁড়ির বাধনে স্থির হয়ে রইলো ফেরি।
কোচে দ্রুত উঠে পড়লাম।সীটে বসে মনের ভেতরে খুব ছটফট করছিলাম।কখন ফেরি থেকে বাস নামবে।ড্রাইভার স্ট্রাট দিয়ে বসে আছ্র।ফেরির একটা সাইরেন বাজালো।ডালা খুলার শব্দ হচ্ছে।আস্তে আস্তে খুলে নীচে জেটির পাটাতনের সাথে লেগে গেল।বিভিন্ন গাড়ির হর্ণের শব্দ শুরু হলো।
কোচ যেই নামা শুরু করলো, আহ কি যে আনন্দ অনুভূত হতে থাকলো।সামনের গাড়ি গুলো একে একে নামছে আর পিছু পিছু আমাদেরটাও
ফেরি থেকে নেমে ঘাট পেরিয়ে অদম্য গতিতে চলতে শুরু করলো
পেছনে থাকা ফেরি আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছিলো আর কিছুদূর পর যেন মিলিয়ে গেলো...
ফেরি কখনোই খারাপ লাগেনি।
